Scuba Diving Komodo

সময়টা ১৯৯১ সালের মে মাস | গরম এর ছুটি পড়েছে | স্কুল ছুটি হলে প্রত্যেক বছর এর মতো আবারো আমরা মামা বাড়ি যাওয়ার জন্য তৈরী | ২২ এ মে সকালের ময়ূরাক্ষী ফাস্ট ট্রেন এ হাওড়া হয়ে তারপর লোকাল ধরে মেচেদা| তারপর বাস এ করে মহিষাদল আর তারপর নৌকা তে হলদি নদী পার করে আবার বাস ধরে নন্দীগ্রাম | এই ছিল ২৫ বছর আগের মামা বাড়ির যাত্রা |

যথারীতি ২১ তারিখ সব জিনিস প্যাক করে খাওয়া দাওয়া করে সবাই শুয়ে পড়েছিলাম | তখন বাজে প্রায় রাত ১০ কি 11 টা | বাড়ির বেল টা বেজে উঠলো | কয়েকজন লোক জোর হয়েছে গেটে | জানা গেলো যে পূর্ব প্রধানমন্ত্রী শ্রী রাজীব গান্ধী নিহত হয়েছেন জঙ্গি হানা তে |

২২ তারিখ মোটামোটি সব কিছুই বন্ধ সারা দেশে | আমাদের মামা বাড়ি যাত্রা একদিন পিছিয়ে গেল | খুবই থমথমে সব কিছু সেদিন | দিন টা প্রায় পুরো টিভি দেখেই কাটলো | ২৩ তারিখ আমরা সারা দিন যাত্রা করে বিকেলে পৌছালাম নন্দী গ্রাম |

তখন আমার বয়েস ৯ বছর | সাঁতার টা শিখে উঠতে পারিনি | দুর্গাপুর এ তখন সুইমিং পুল বলতে শুধু স্টিল টাউনশিপ এ একটা মাত্র | বাকি দূরের কিছু গ্রাম এ পুকুর ছিল | সাঁতার শেখার একমাত্র উপায় মামা বাড়ি তে | মামাতো ভাই বুধা নতু নতুন সাঁতার শিখে ছে | নন্দী গ্রাম এ প্রচুর পুকুর আর আমরা প্রায় নতুন পুকুর এ গিয়ে কলা গাছ দিয়ে চেষ্টা করতাম শেখার | ২৪ তারিখ সকালে আমি আর বুধা গেলাম জানকীনাথ মন্দির এর পিছনে একটা পুকুরে | বুধা বললো যে আমাকে সাঁতার শেখাবে |

বুধা আমাকে একটু গভীর জলে নিয়ে যেতে আমি ভয়ে ওকে ধরে নীলাম আর ও পারলো না আমাকে নিয়ে ভেসে থাকতে | আমি জল খেতে থাকলাম| এর পর সব আমার শোনা কথা | বুধা তখন সোজা পাড়ে উঠে গিয়ে বাঁচানোর জন্য কাউকে খুঁজতে লাগলো | বোন বসে ছিল পাড়ে আর তখন ও সোজা রাস্তার দিকে দৌড়ে গেলো | এক মাস্টার মশাই যিনি মামাবাড়ি তে ভাড়া থাকতেন, তিনি দেখতে পেয়ে জলে ঝাপান | আমাকে তুলে প্রথমে পেট থেকে চিপে চিপে সব জল বার করে সোজা মহকুমা হাসপাতাল নিয়ে যাওয়া হয় | তারপর ভ্যান এ করে ঘর |

যখন চোখ খুললাম, দেখলাম চোখের সামনে অনেক লোক বসে আছে | সবাই আমার দিকে পেছন করে | ঝাপসা দেখাচ্ছে সব কিছু | দূরে একটা ওয়েবেলনিক্কো টিভি চলছে | সবার নজর টিভি দিকে | আস্তে আস্তে একটু নোৱাৰে চেষ্টা করলাম | একজন উঠে এলো | তারপর প্রায় ঘন্টা খানে কেটে গেলো | পুরো গ্রাম এর লোক তখন দূরদর্শন এ প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর শেষ কৃত্য দেখছে | বুঝলাম আজ আমি ফিনিক্স, মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছি |

এর পর প্রায় ১৭ বছর কেটে গেছে | সাঁতার টা শিখে নিয়েছি | কিছু দিন আগে সুদূর ফ্লোরেস দ্বীপ পুঞ্জ তে স্কুবা ডাইভিং করে ফিরে এলাম | এই গভীর সমুদ্রে জলের তোলাতে বহু প্রজাতির মাছ আর জীব জন্তু | এই অনুভব আজ সম্পুর্ন আলাদা | একে আগে কয়েকবার স্কুবা করেছি যেমন থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ভেনেজুয়েলা এবং ফ্লোরিদা | কিন্তু ফ্লোরেস এর জলের কারেন্ট খুব বেশি | সোজা নামার পর ভীষণ গতির কারেন্ট টেনে নিয়ে যাই এক দিকে | কোনো পাথর ধরে থাকতে পারলে, কিছু ক্ষণ এক জায়গা তে থাকা যাই | এই কারেন্ট এর জন্য, এখানে দারুন প্রমানে মন্টা রে, সার্ক , টার্টল আর বিভিন্ন প্রজাতির কোরাল পাওয়া যাই | কারেন্ট এর সাথে ডুবন করার এটাই প্রথম অভিজ্ঞতা |

মন্টা রে মাছ বিশাল বোরো | প্রায় ২১ ফুট লম্বা আর তারা কারেন্ট এর বিপরীতে সাঁতার কাটে | এদের দেখলে মনে হয় যেন এরা হাওয়া তে পাখা মেলে উড়ছে | এতো কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য হবে ভাবিনি | সার্ক আর টার্টল এতো কাছ থেকে দেখে ভাবিনি যে যা সারা জীবন টিভি তে দেখে এলাম, সে টা নিজের চোখে দেখছি |


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *